মানসিক রোগে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের বাবা-মায়েরা যেমনটা বলেন, তাদের সন্তানদের মধ্যে যে ‘কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে’ তার প্রথম লক্ষণগুলো বয়ঃসন্ধিকালে দেখা দেয় । এটা আগে থেকেই জানা ছিল যে আমরা বয়ঃসন্ধিকালে মানসিক রোগের (সিজোফ্রেনিয়া, বিষণ্ণতা এবং মাদকাসক্তি সহ) প্রতি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ থাকি, কিন্তু এই পর্যায়ের সাথে সম্পর্কিত একটি নতুন জিনের আবিষ্কার মানসিক রোগের বিকাশকে আরও ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী প্রমাণিত হতে পারে।
ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ডগলাস রিসার্চ সেন্টারের গবেষকরা ডিসিসি (DCC) জিনটি শনাক্ত করেছেন, যা ‘কিশোর জিন’ নামেও পরিচিত। এই জিনটি কৈশোরকালে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে ডোপামিনের সংযোগ নিয়ন্ত্রণ করে; তাই, এই জিনের কার্যকারিতায় ব্যাঘাত ঘটলে (উদাহরণস্বরূপ, মানসিক চাপ বা মাদকাসক্তির কারণে) তা কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিচার-বিবেচনা এবং নমনীয়তার সাথে সম্পর্কিত ) শিখন, প্রেরণা এবং জ্ঞানীয় প্রক্রিয়ার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। যেহেতু মস্তিষ্কের এই অঞ্চলটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত বিকশিত হতে থাকে, তাই এটি কৈশোরের অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার প্রবল ঝুঁকিতে থাকে ।
“কিছু নির্দিষ্ট মানসিক ব্যাধি প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যকারিতার পরিবর্তন এবং ডোপামিন কার্যকলাপের পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে ,” জানান এই গবেষণার প্রধান লেখক এবং ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক সেসিলিয়া ফ্লোরেস। “যদিও প্রিফ্রন্টাল সংযোগ ব্যবস্থা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার শুরুর দিক পর্যন্ত বিকশিত হতে থাকে, এই প্রক্রিয়াগুলো এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ অজানা ছিল ।”
গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কারটি মস্তিষ্কের বিকাশের আরও ভাল বোঝার জন্য প্রথম সূত্র সরবরাহ করে এবং গুরুতর মানসিক ব্যাধি মোকাবেলায় প্রতিশ্রুতি রাখতে পারে।
ফ্লোরেস সিটিভি নিউজকে বলেন, “আমরা কৈশোরকালে ডিসিসি (DCC)-এর সেই কার্যকারিতা ও পরিমাণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি, যা প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় নির্দিষ্ট কিছু মানসিক রোগের ঝুঁকি তৈরি করে।” “গবেষণাটি থেকে বোঝা যায় যে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে কৈশোরকালে ডিসিসি (DCC) জিনের পরিমাণ বা মাত্রা পরিবর্তিত হতে পারে । ”
সিএইচইও-এর শিশু ও কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ হেজেন গ্যান্ডি উল্লেখ করেছেন যে, এই গবেষণাটি আংশিকভাবে ইঁদুরের উপর পরিচালিত হয়েছিল। এর অর্থ হলো, মানুষের ক্ষেত্রেও সিডিডি জিনটি একই ভূমিকা পালন করে কিনা, তা নির্ধারণ করার জন্য আরও অনেক গবেষণার প্রয়োজন ।
“আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই গবেষণাটি আমরা প্রাণীর উপর করেছি; তাই, তাদের থেকে প্রাপ্ত ফলাফল মানুষের আচরণের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সময় আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে ,” গ্যান্ডি সিটিভি নিউজকে বলেন। “ এটি মানব মস্তিষ্কের বিকাশ বোঝার বিশাল ধাঁধার একটি অংশ মাত্র । আমি মনে করি, এটি কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় এবং উন্নততর হস্তক্ষেপমূলক কৌশল প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তার দিকেই ইঙ্গিত করে।”
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা একমত যে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে এমন কিশোর-কিশোরীদের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে থেরাপি ও সহায়তা একটি সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের দিকে পরিচালিত করতে পারে । ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রিধা জুবার সিটিভি নিউজকে বলেন, “আপনি যদি কোনো ধরনের সহায়তা পান, তাহলে মস্তিষ্কের কার্যকারিতার অস্বাভাবিকতাগুলো সংশোধন করতে পারার সম্ভাবনা থাকে ।”
“গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কিশোর-কিশোরীর মধ্যে মানসিক রোগের লক্ষণ দেখা যায়, তাদের যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা করা প্রয়োজন, ” জুবার যোগ করেন। “এই ধরনের ব্যাধিতে ভুগছে এমন তরুণ-তরুণীদের সংশোধন ও সাহায্য করার জন্য খুব দ্রুত হস্তক্ষেপ করা জরুরি।”
ডক্টর হেজেন যেমনটা উল্লেখ করেছেন, এটা সত্যি যে এখনও অনেক কাজ বাকি আছে। কিন্তু মানব মস্তিষ্কের উপর ‘কৈশোরকালীন জিনের’ এই প্রভাব যদি শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়, তবে নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির বিকাশের মাধ্যমে মানসিক রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের মান উন্নত করা সম্ভব হবে। এটি মনোরোগবিদ্যা ও মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে গণ্য হবে।